
রাজনীতি ও দেশ দুটোর সীমানা থেকেই কার্যত নির্বাসনে এমপি মান্নান পুত্র সজীব!
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রভাব, দাপট আর ক্ষমতার অপব্যবহারের এক বিতর্কিত অধ্যায়ের নাটকীয় পরিসমাপ্তি ঘটলো এমপি পুত্র খাইরুল ইসলাম সজীবের ঘটনায়।
চাঁদাবাজির অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই যুবদল নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়লো একটি মুচলেকার সামনে—যে মুচলেকা শুধু তার মুক্তির শর্তই নয়, বরং তাকে রাজনীতি ও দেশ দুটোর সীমানা থেকেই কার্যত নির্বাসনে পাঠিয়েছে।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি এমপি আজহারুল ইসলামের ছেলে ও জেলা যুবদলের বহিষ্কৃত সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর গত ২১ জুন গভীর রাতে একটি কঠোর শর্তসাপেক্ষ মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই মুচলেকার শর্ত ছিল একেবারে স্পষ্ট—রাজনীতি থেকে স্থায়ী বিদায় এবং দেশত্যাগ। অর্থাৎ, মুক্তি মিললেও মাটি হারাতে হয়েছে।
সূত্র বলছে, মুচলেকা দেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায়, ২৮ জুন, তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। গন্তব্য—ইউরোপের দেশ ফ্রান্স। এক সময় যিনি নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতেন, সেই সজীব এখন কার্যত রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত।
অভিযোগের তালিকা ছিল গুরুতর ও বিস্তৃত। সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ ও কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলে কারখানা, পরিবহন ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের নামে চাঁদাবাজি, ট্রাক আটকে অর্থ আদায় এবং ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি—এসব অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিলেন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, দাবিকৃত অর্থ না দিলে পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হতো, যা সরাসরি শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করত। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে পুরো শিল্পাঞ্চলকে জিম্মি করার অভিযোগই উঠে এসেছে তার বিরুদ্ধে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শেষ পর্যন্ত তাকে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় হেফাজতে নিতে হয়। প্রায় ১২ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদের পর রহস্যজনকভাবে তাকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়—যা নিয়েই উঠেছে বড় প্রশ্ন। একজন এমপি পুত্র, যার বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে, তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় না নিয়ে কেবল মুচলেকায় মুক্তি—এটি দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল সজীবকে দল থেকে বহিষ্কার করে। কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নুরুল ইসলাম সোহেল স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়—দলের কেউ তার অপকর্মের দায় নেবে না, এবং নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এক সময় সজীবের ছিল দাপুটে অবস্থান। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন এবং দলীয় শৃঙ্খলাকেও নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতেন। এমনকি কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বা বহিষ্কার করাতে ‘একটি ফোনই যথেষ্ট’—এমন দাবিও করতেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সূত্রগুলো।
কিন্তু সময়ের পালাবদলে সেই দাপটই হয়ে উঠেছে পতনের কারণ। ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি এবং প্রভাব খাটানোর রাজনীতি শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দিয়েছে রাজনৈতিক অন্ধকারে। মুচলেকার শর্তে দেশত্যাগ—এ যেন এক প্রভাবশালী পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীর জন্য চরম পরিণতি।
এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির পতনের গল্প নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা অপরাধের এক নগ্ন উদাহরণ। প্রশ্ন রয়ে গেছে—আইনের চোখে সবাই কি সত্যিই সমান, নাকি প্রভাবশালীদের জন্য এখনও আলাদা পথ খোলা ?
আপনার মতামত লিখুন :