পূজা-অর্চনা শেষে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হয়েছে দেবী দুর্গাকে


Kamrul Islam Sohel প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২১, ২০২৬, ১০:০৫ অপরাহ্ন / ১০০০
পূজা-অর্চনা শেষে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হয়েছে দেবী দুর্গাকে

পূজা-অর্চনা শেষে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হয়েছে দেবী দুর্গাকে

 

 

পূজা-অর্চনা, আনন্দ-উৎসব আর ভক্তদের প্রার্থনা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হয়েছে দেবী দুর্গাকে।

 

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে শোভাযাত্রা সহকারে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় বিসর্জন ঘাটে। ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্য আর ভক্তদের উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা।

 

এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব।

 

দেবীকে বিদায় জানাতে সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তদের উপস্থিতি ছিল। পূজা ও পুষ্পাঞ্জলি শেষে শুরু হয় বিসর্জনের প্রস্তুতি। পরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় প্রতিমাগুলো নিয়ে যাওয়া হয় নির্ধারিত বিসর্জন ঘাটে। উৎসবের শেষ দিনে আনন্দের পাশাপাশি ভক্তদের মধ্যে দেখা দেয় বিষাদের ছায়া। এক বছরের অপেক্ষা শেষে আবারও দেবী দুর্গার আগমন ঘটবে—এমন প্রত্যাশায় প্রার্থনা করেন ভক্তরা।

 

বিসর্জন ঘাটে দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে অনেকের চোখেমুখে ছিল আবেগের ছাপ। ভক্তদের প্রার্থনায় উঠে আসে দেশ ও মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা, সুখ-সমৃদ্ধি এবং সব ধরনের অপশক্তির বিনাশের আকাঙ্ক্ষা।

 

নগরীর পাঁচ নম্বর ঘাট এলাকায় প্রতিমা বিসর্জন দেখতে আসা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়ন্তি বলে, “দশমীর লগ্ন শুরু হওয়া মানেই মন খারাপের শুরু। খুব কষ্ট লাগছে, মা চলে যাচ্ছেন। এই কয়েক দিন মা আমাদের মাঝে ছিলেন, তাই আনন্দে কেটেছে। মায়ের কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন দেশ থেকে সব ধরনের অপশক্তি দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং সবাইকে ভালো রাখেন।”

 

ভক্ত শুক্লা রানী বলেন, “এই কয়েকটা দিন খুব আনন্দে কেটেছে। মা দুর্গা আমাদের মাঝে ছিলেন, চারপাশ উৎসবমুখর ছিল। কিন্তু আজ মা চলে যাচ্ছেন, তাই বুকটা কষ্টে ভরে উঠছে। আবারও এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। প্রার্থনা করেছি, দেশ যেন শান্তিময় হয় এবং সবার জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে।”

 

নির্বিঘ্ন বিসর্জনে যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ

প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নগরীতে যানজট এড়ানো ও শোভাযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শোভাযাত্রার জন্য নির্দিষ্ট পথ নির্ধারণের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে একমুখী যান চলাচল চালু রাখা হয়। আঞ্চলিক ও দূরপাল্লার বাস এবং পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলেও আরোপ করা হয় সময়ভিত্তিক বিধিনিষেধ।

 

নির্দেশনা অনুযায়ী, বুধবার দুপুর ২টার পর আঞ্চলিক ও দূরপাল্লার বাস চাঁদমারী মোড় থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। ওই মোড় অতিক্রম করে বাসগুলোকে মেট্রো হলের সামনের মোড়, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল কিংবা বঙ্গবন্ধু সড়কের দিকে যেতে দেওয়া হয়নি। বিকল্প বাস পার্কিংয়ের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয় হাজীগঞ্জ নতুন রাস্তা। বাস টার্মিনালের আঞ্চলিক বাস ও মেট্রো হল মোড়ের দূরপাল্লার বাস সেখানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।

 

এ ছাড়া নিতাইগঞ্জ এলাকা থেকে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী, ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান ও ট্যাংকলরি বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত ১টার আগে মণ্ডলপাড়া সেতু পার হতে পারবে না।

 

তিন পথে শোভাযাত্রা, নিরাপত্তায় পুলিশ

নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদি জানান, প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে তিনটি নির্দিষ্ট পথ নির্ধারণ করা হয়েছিল।

 

তিনি জানান, পঞ্চবটী থেকে আসা শোভাযাত্রাকে চাষাঢ়া ও ২ নম্বর রেলগেট হয়ে বিসর্জন ঘাটে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। নিতাইগঞ্জ ও টানবাজার এলাকার শোভাযাত্রা মণ্ডলপাড়া সেতু পার হয়ে ২ নম্বর রেলগেট দিয়ে ঘাটে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে বরফকল মাঠ ও খানপুর থেকে আসা শোভাযাত্রাকে মেট্রো হল মোড়, মিশনপাড়া ও চাষাঢ়া হয়ে ২ নম্বর রেলগেট দিয়ে বিসর্জন ঘাটে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও জানান, বিসর্জন শেষে খালি যানবাহন ঘাট থেকে কাঠপট্টি রোড ও মাউরা হোটেল হয়ে মেট্রো হল মোড় দিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে পারবে। এ জন্য ঘাট থেকে মাউরা হোটেল হয়ে মেট্রো হল পর্যন্ত সড়কে একমুখী যান চলাচল কার্যকর রাখা হয়। একই সঙ্গে মেট্রো হল মোড় থেকে মাউরা হোটেল কিংবা কালীবাজারের দিকে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

 

গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা

সরেজমিনে দেখা যায়, ২ নম্বর রেলগেট থেকে ১ নম্বর রেলগেট হয়ে বিসর্জন ঘাট পর্যন্ত এবং ১ নম্বর রেলগেট থেকে কালীবাজারমুখী সড়কে একমুখী যান চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া চাঁদমারী, সরকারি মহিলা কলেজ, মেট্রো হল, গলাচিপা মোড় ও মণ্ডলপাড়া সেতু এলাকায় ছয় আসনের বড় আকারের অটোরিকশার ইউটার্নের ব্যবস্থা চালু করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন।

 

প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন।

 

সব মিলিয়ে কঠোর নিরাপত্তা ও বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটলেও ভক্তদের মনে রয়ে যায় বিদায়ের বিষাদ, আর প্রার্থনায় থাকে আগামী বছর আবারও দেবী দুর্গার আগমনের প্রত্যাশা—দেশ ও মানুষের কল্যাণ, শান্তি ও সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা।