প্রকাশিত:
৪ নভেম্বার ২০২৬, ১৭:৩২
ফতুল্লায় পুলিশের মামলায় ২১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত নামা ১৫০০'শ : গ্রেফতার-৬
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিকদের আন্দোলনের আড়ালে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং সংঘাত উসকে দেওয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও এক হাজার থেকে দেড় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এস,আই) মিলন ফকির বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
পুলিশ ছয়জনকে গ্রেফতার করে বুধবার দুপুরে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠিয়েছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলো ফতুল্লা মডেল থানার লামাপাড়ার মফিজুল ইসলামের পুত্র মোঃ শামীম হাসান(২৮), কোতালেরবাগ বউ বাজার এলাকার বিল্লাল হোসেনের পুত্র মোঃ মামুন(২৬),ফতুল্লা রেলস্টেষন এলাকার বাচ্চু মিয়ার পুত্র মোঃওমর ফারুক(৩৮),রামারবাগ এলাকার ইমান তৌফিকের পুত্র ইমান ইমন(২৬), কোতালের বাগ এলাকার মৃত লিয়াকত হোসেনের পুত্র শাহিন আহম্মেদ ও কায়েমপুর এলাকার আক্তারুজ্জামানের পু্ত্র আতিকুর রহমান(২৫)।
বিষয়টি নিশ্চিত করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফতুল্লা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এস,আই) শামিম জানান, গ্রেফতারকৃতদেরকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে বুধবার দুপুরে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মামলায় এজাহারনামীয় অপর আসামীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন ফতুল্লার কাঠেরপুল এালাকর যুবলীগ নেতা আজমত আলী,ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোস্তফা কামাল,কার্যকরী সদস্য মজিবর,নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি টিপু সুলতান, মোফাজ্জল হোসেন চুন্নু, রাকিব হোসেন, ওয়াসিম,রতন,মোঃ রাকিব, এবং ছাত্রলীগ নেতা সোহাগ ও সেলিমের নাম রয়েছে। এ ছাড়া প্রজন্মলীগের ফতুল্লা থানা শাখার সহসভাপতি হিসেবে পরিচিত জনিসহ আরও কয়েকজনের নাম এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের দায়ের করা এজাহার অনুযায়ী, গত ৩ নভেম্বর দুপুর আড়াইটার দিকে ফতুল্লার শিবু মার্কেট, কাঠেরপুল ও ইরান টেক্সটাইল এলাকার আবির ফ্যাশন, পলমল গার্মেন্টস, মাইক্রো ফাইবার, মেট্রো গার্মেন্টস, টাইম সোয়েটার ও মডার্ন গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার শ্রমিকেরা একত্রিত হয়ে চাষাঢ়া-সাইনবোর্ড লিংক রোডের শিবু মার্কেট থেকে ফতুল্লা স্টেডিয়াম পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করেন।
এজাহারে দাবি করা হয়, বেতন বৃদ্ধির দাবিকে সামনে রেখে শ্রমিকদের সংগঠিত করার পেছনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ইন্ধন ও উসকানি ছিল। এর মাধ্যমে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা, সরকার উৎখাতের চেষ্টা এবং দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার পরিকল্পনা ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে নিতে প্রথমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের একটি অংশ সড়কে টায়ারসহ বিভিন্ন সামগ্রীতে আগুন জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেন।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ সাইনবোর্ডের দিকে এগিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের নির্দেশনা অমান্য করে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইটের আঘাতে কনস্টেবল নাঈম ও কনস্টেবল সাগর আহত হন। পাশাপাশি উৎসব ও বন্ধন পরিবহনসহ কয়েকটি যানবাহনের কাচ ভাঙচুরের অভিযোগও আনা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা বিভিন্ন গ্যাসগান থেকে মোট ৮৩ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেন। এর মধ্যে ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও মুন্সিগঞ্জে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত গ্যাসগান থেকে এসব টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশের দাবি,প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারক্ত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উসকানি ও সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।
সচেতন মহলের মতে,মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন, সেই আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ এবং সংঘর্ষে পুলিশের বলপ্রয়োগ—প্রতিটি বিষয়েই পৃথক ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এছাড়া সংঘর্ষের আগে ও পরের ভিডিও ফুটেজ, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং পুলিশের ব্যবহৃত টিয়ারশেলের হিসাব পর্যালোচনা করলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।অন্যথায় প্রকৃত উসকানিদাতারা আড়ালে থেকে যেতে পারেন।
ফলে ফতুল্লার এই সংঘর্ষ এখন শুধু একটি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা নয়; বরং আন্দোলনের নেপথ্যে কারা সক্রিয় ছিলেন, সংঘাতের সূত্রপাত কীভাবে এবং রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই তদন্তের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য করুন: