নবজাতককে মেরে ফেলার চেষ্টা: অভাবী ঘরের শিশুটির ‘দায়িত্ব’ নিলেন দম্পতি


Kamrul Islam Sohel প্রকাশের সময় : এপ্রিল ৪, ২০২৬, ২:২৫ অপরাহ্ন / ১০০০
নবজাতককে মেরে ফেলার চেষ্টা: অভাবী ঘরের শিশুটির ‘দায়িত্ব’ নিলেন দম্পতি

নবজাতককে মেরে ফেলার চেষ্টা: অভাবী ঘরের শিশুটির ‘দায়িত্ব’ নিলেন দম্পতি

 

নারায়ণগঞ্জে এক দম্পতির ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা নবজাতক কন্যা সন্তানটির দায়িত্ব নিয়েছেন স্থানীয় আরেক দম্পতি। তারা আইনগতভাবে শিশুটিকে দত্তক নিতে চান বলেও জানিয়েছেন।

 

বৃহস্পতিবার ভোরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার বক্তারকান্দি এলাকার ভাড়া বাসায় শিশুটির জন্ম হয়েছিল। তার মা গৃহিণী, বাবা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

 

অভাবের সংসারে তিন সন্তানের পর আরেকজনকে নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়বেন ভেবে সেদিন সকালেই নবজাতককে বাজারের ব্যাগে ঢুকিয়ে নদীর পাড়ে ফেলে যাওয়ার চেষ্টা করেন শিশুটির মা।

 

কিন্তু স্থানীয়রা টের পেলে তা আর সম্ভব হয়নি। পরে থানা পুলিশ ও সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে মুচলেকায় শিশুটিকে ফের মা-বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়।

 

কিন্তু শিশুটি তার বাবা-মায়ের কাছে কতটা নিরাপদ তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকে। পরে ওই এলাকার একটি পরিবার দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে পিতা-মাতার অনাপত্তিতে তাদের হাতেই শিশুটিকে তুলে দেন স্থানীয়রা।

 

শিশুটির লালন-পালনের দায়িত্ব নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা সুলতান মাহমুদ আপন বলেন, “আমাদের দুটি ছেলে আছে। আমরা এই কন্যা সন্তানটির দায়িত্ব নিয়েছি। শিশুটিকে যখন জখম অবস্থায় ব্যাগের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়, তখনও আমার স্ত্রীই তাকে বুকের দুধ খাইয়েছে। তাকে হাসপাতালেও নিয়ে গেছি আমরা।

 

“শিশুটির গলায় লাল ক্ষত হয়েছিল, তাকে হয়তো গলায় চেপে ধরার চেষ্টাও করা হয়েছিল। এখন আমাদের কাছে শিশুটি পুরোপুরি সুস্থ আছে। আমরা তাকে বাবা-মার আদরেই বড় করে তুলতে চাই”, বলেন আপন।

 

এদিকে, শুক্রবার দুপুরে ওই এলাকায় গিয়ে ভাড়া বাসাটিতে শিশুটির বাবা-মাকে পাওয়া যায়নি।

 

প্রতিবেশীরা জানান, রংপুর জেলার বাসিন্দা এ দম্পতি কাজের সুবাদে বক্তারকান্দির ওই বাড়িটিতে গত দুই সপ্তাহ ধরে ভাড়া থাকছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নবজাতককে নিয়ে বাড়ি ফিরে তারা স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়েন।

 

বাড়ির মালিকও তাদের এ বাড়িতে আর থাকতে দিতে চাচ্ছিলেন না। তাই রাতেই তারা বাসে রংপুরে গ্রামে ফিরে গেছেন।

 

বাড়ির মালিক মোজাম্মেল হককে পাওয়া না গেলেও ভাড়াটিয়া মো. মোস্তফা বলেন, মার্চের শেষদিকে দুই কক্ষের ঘরটি ভাড়া নিয়েছিলেন তারা। ঘরে কয়েকটা হাড়ি-পাতিল আর তোশক বিছানো ছিল। আর কোনো আসবাবপত্র ছিল না। ওইসব নিয়েই তারা চলে গেছেন।

 

স্থানীয় দুজন নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নবজাতক শিশুকে নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সবাই তাদের বাড়িতে ভিড় করতে থাকে।

 

এক পর্যায়ে বাড়িওয়ালাও বলেছে, তাদের আর এ বাড়িতে রাখবেন না। আবার শিশুটিকেও তাদের সঙ্গে দিতে নারাজ ছিল এলাকাবাসী। পরে এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের আলাপের পর ওই এলাকার বাসিন্দা ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার আমজাদ হোসেনের ছেলে সুলতান মাহমুদ আপন শিশুটিকে লালন-পালন করার দায়িত্ব নেন।

 

অপর আরেক নারী বলেন, “এলাকায় আমজাদ সাহেবের নাম-ডাক আছে। তাগো কাছেই মাইয়াটা ভালো থাকবো। মা-বাবা বাচ্চাটারে নিয়া আবার কী করতো, তার তো ঠিক নাই।

 

পরে শুক্রবার সন্ধ্যায় মোবাইলে কথা হয় নবজাতকের বাবার সঙ্গে। তিনি রংপুরে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে আছেন বলে জানান। স্ত্রীকে তার বাবার বাড়িতে রেখে এসেছেন।

 

তবে, তিনি দাবি করেন, স্ত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়া এবং সন্তান প্রসবের বিষয়টি তিনি জানতেন না। তার স্ত্রী বিষয়টি পরিবারের সকলের কাছেই গোপন করেছিলেন।

 

স্ত্রীর শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে জানতে চাইলে তার স্ত্রী বিষয়টি শারীরিক স্থূলতা বলে এড়িয়ে যেতেন দাবি করেন তিনি।

 

শারীরিক প্রতিবন্ধী এই পিতা বলেন, “আমি আগে ঢাকায় কাজ করছি। নারায়ণগঞ্জের বন্দরে কয়েকজন পরিচিত থাকায় এইখানে বাসা ভাড়া নিয়ে স্ত্রী আর এক ছেলেকে নিয়া উঠি।

 

“দুইটা ঘরের একটা ঘরে আমাদের গ্রামের আরেক লোক ওঠার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আসেননি। ওই ঘরেই রাতে বাচ্চা প্রসব করেন আমার স্ত্রী। কিন্তু আমাকে কিছু সে জানায়নি। পরে সব জানলাম।”

 

স্ত্রীর এমন আচরণের কারণ জানতে চাইলে এ ব্যক্তি বলেন, “আমাদের বিয়ে হইছে অন্তত ১৪ বছর। আর্থিক অবস্থা ভালো না, এইটা সত্য। আমার আগেরও তিনটা সন্তান আছে। আমার মা, আমার স্ত্রীরে আর সন্তান না নেওয়ার নাকি কথা বলছিল। আরেক সন্তান নিলে খাওয়ামু কি, এই ভয় থেকে নাকি আমার স্ত্রী এই কাজ করছে।”

 

“কিন্তু আমি জানলে এই কাজ কখনোই করতে দিতাম না,” বলেন তিনি।

 

অসহায় এই বাবা বলেন, “আমার বাচ্চারে আমি ‘নির্দাবি’ (কোনো দাবি-দাওয়া ছাড়াই) করে তাগো (আপন দম্পতি) হাতে তুইলা দিছি। আমি বাচ্চা বেচি নাই। কিন্তু আমার বাচ্চা তাগো কাছে থাকলে ভালো জীবন পাইবো।

 

“আমারে কইছে দেখা-সাক্ষাৎ নিয়া কোনো বাধা দিবো না। তাই আমি স্ট্যাম্পে সাইন কইরা আসছি,” বলেন তিনি।

 

প্রয়োজনে আইনগতভাবে দত্তক দেওয়ার ব্যাপারেও তিনি আগ্রহী বলে জানালেন।

 

শিশুটিকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে অবগত ছিলেন বন্দর ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আরিফ তালুকদার ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ফয়সাল কবীর। তাদের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার বিকালে মুচলেকা নিয়ে বাবা-মার কাছে নবজাতক শিশুটিকে হস্তান্তর করা হয়েছিল।

 

শুক্রবার রাতে এ দুই কর্মকর্তা মোবাইলে এ প্রতিবেদককে বলেন, “শিশুটিকে আরেক দম্পতি নিজেদের হেফাজতে নিয়েছেন। আমরা বিষয়টি মনিটর করছি। শিশুটির বাবা-মা ও বর্তমানে যাদের জিম্মায় আছে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় আছে।”

 

এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আগামী রোববার বসার পরিকল্পনাও করেছেন বলে জানান সমাজসেবা কর্মকর্তা ফয়সাল কবীর।

 

  • তিনি বলেন, এটিকে শিশু কল্যাণ বোর্ডে তোলা যায় কিনা তাও ভাবছেন।