
ফতুল্লার আলীরটেক ও বক্তাবলীতে শোকের মাতম
দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউন (বর্তমান কোমানি) এলাকার সমোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬ বাংলাদেশির মধ্যে ৫ জনই নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার বাসিন্দা। মর্মান্তিক এ ঘটনায় আলীরটেক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের তিনটি গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি, বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে কান্নায়।
নিহতরা হলেন— আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে মো. ফাহিম (২৯), একই গ্রামের আলী মিয়ার ছেলে আপন আহমেদ (২৩), মৃত শরব আলীর ছেলে নূর মোহাম্মদ (৫৫), তৈলখিরারচর গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল (২৬), বক্তাবলী ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামের মো. শাহিন (৩০) এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার মিরকাদিম পৌরসভার মৃত সালাম ব্যাপারির ছেলে মো. শাহিন (৩০)।
জানা গেছে, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ভোররাতে দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউন থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের সমো এলাকায় ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেখানে ফতুল্লার আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রওশন মেম্বারের ভাই রতনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থাকা আবাসিক কক্ষে সাতজন বাংলাদেশি ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে হঠাৎ আগুন ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই পুরো কক্ষ ধোঁয়া ও আগুনে ছেয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ছয়জনের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন আল আমিন নামে আরও এক বাংলাদেশি। তাকে উদ্ধার করে কুইন্সটাউন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট কিংবা অন্য কোনো দুর্ঘটনা থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি তদন্ত করছে দক্ষিণ আফ্রিকার সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস।
স্বজনদের ভাষ্য, মো. ফাহিম প্রায় ১১ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতেই বিদেশে থেকে কঠোর পরিশ্রম করতেন তিনি। তার উপার্জনেই চলত পুরো সংসার।
ফাহিমের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর বাবা মনির হোসেন নির্বাক হয়ে পড়েছেন। মা ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ি।
ফাহিমের ভগ্নিপতি মো. সজীব বলেন, ফাহিমের পাঠানো টাকাতেই পুরো সংসার চলত। এখন আমরা কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।
নিহত আপন আহমেদ চার বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর বাবা আলী মিয়া স্থানীয়ভাবে একটি চায়ের দোকান চালান এবং মা আকলিমা বেগম গৃহিণী। বড় ভাই জুয়েল সৌদি আরবে কর্মরত।
আপনের মামা রাসেল বলেন, পরিবারের ভাগ্য বদলাতে বিদেশে গিয়েছিল। কিন্তু লাশ হয়ে ফিরবে, এটা কখনো ভাবিনি।
একই ঘটনায় আলীরটেকের ক্রোকেরচর গ্রামের তিনজন, তৈলখিরারচর গ্রামের একজন এবং বক্তাবলীর কানাইনগর গ্রামের একজন নিহত হওয়ায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ভিড় করছেন। সবাই নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, নিহতদের অধিকাংশই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের মৃত্যুর ফলে পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে স্বজনরা বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন। স্বজনদের ভাষ্য, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং মরদেহ দেশে আনার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরাও নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বিকালে নিহত ফাহিমের বাড়ির সামনে সাংবাদিকদের জানান, নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলায়। আরেকজনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। ভুক্তভোগী পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি এবং আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের শান্তনা দিয়েছি। সকল প্রক্রিয়া শেষে যত দ্রুত নিহতের মরদেহ দেশে আনা যায় স্বজনদের এই দাবি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করবো।
আপনার মতামত লিখুন :